ভারতীয় সংগীত জগতের এক কিংবদন্তি নাম— আরতি মুখোপাধ্যায়। সুরের জগতে তার অবদান অনস্বীকার্য। বাংলা থেকে হিন্দি, নেপথ্য গান থেকে লাইভ স্টেজ— সবখানেই তিনি নিজের প্রতিভা ছড়িয়ে দিয়েছেন। ৬০টিরও বেশি হিন্দি গান, ১৫ হাজারেরও বেশি বাংলা অনুবাদিত গান— সংখ্যার থেকেও বড় হয়ে উঠেছে তার কণ্ঠ।
সম্প্রতি এক সাংবাদিক বৈঠকে এসে অনেক অজানা কথা জানালেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। অকপট স্বীকারোক্তিতে বললেন— “আমি নিজেই রাজনীতির শিকার!”
“গানের যাত্রা শুরু অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে…”
সাংবাদিকরা যখন তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, সংগীত জীবনের শুরুটা কেমন ছিল? তিনি বললেন, “কণ্ঠ ঈশ্বরপ্রদত্ত ঠিকই, কিন্তু সেটাকে ঠিকভাবে ব্যবহার করাটা অভ্যাস আর বিচক্ষণতার ব্যাপার। আমি মাত্র ১৪ বছর বয়সে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে প্রথম গান গাই। তখন থেকে শুরু করে এখনও গেয়ে চলেছি। সিনেমার গান মানে শুধু গাওয়া নয়, সেখানে অভিনয়ও থাকে। কোথায় সেল বাড়াতে হবে, কোথায় কমাতে হবে— সবটাই শেখা হয়েছে কাজে করতে করতেই।”
“রবীন্দ্রসঙ্গীত এইভাবে রিমেক চলে না!”
বর্তমানে বিভিন্ন পুরনো গান, বিশেষত রবীন্দ্রসঙ্গীত, রিমিক্স বা রিমেক হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন আরতি দেবী। তিনি বলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান তো শুধু গান নয়, সেটা একটা ভাবনা, একটা দার্শনিকতা। গানের ভালো জ্ঞান না থাকলে তার সৃষ্টির গভীরতা কেউ বুঝবে কী করে? তাই যেভাবে আজকাল রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবর্তন হচ্ছে, সেটা একেবারেই উচিত নয়।”
“রিয়ালিটি শো থেকে শিল্পী উঠে আসতে পারে, তবে…”
বর্তমানে বিভিন্ন মিউজিক রিয়ালিটি শো নিয়ে কী ভাবেন তিনি? এমন প্রশ্নে আরতি মুখোপাধ্যায় বলেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই অনেকে উঠে আসছে। অনেকেই ভালো গায়, কিন্তু তাদের নতুন গান গাইতে দেওয়া হচ্ছে না কেন বুঝি না। সব সময় পুরনো গানই গাওয়ানো হচ্ছে। আমাদের সময় আমরা নিজেরা নতুন গান পেতাম, অন্য কারও গাওয়া গান নয়। এখন তো সবাই তাড়াতাড়ি বিখ্যাত হয়ে টাকা রোজগার করতে চায়, বাবা-মারাও সে দিকেই ঠেলে দেয়।”
“আমার প্রিয় শিল্পীরা ছিলেন হেমন্তদা, শ্যামল মিত্র, মান্নাদা…”
সংগীত জগতে যাদের তিনি অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখতেন, তাদের কথা বলতে গিয়ে বলেন, “হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র— কী গলা ছিল তাদের! মান্না দে-র শিক্ষাদীক্ষা, গানের জ্ঞান— অনন্য। আর আমি তো ছোটবেলায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ছাড়া আর কাউকে চিনতামই না। প্রত্যেকের একটা নিজস্ব স্টাইল ছিল, যেটা এখন আর দেখা যায় না।”
“রাজনীতি সব জায়গায়, আমিও বাদ যাইনি”
কেন এক সময় হঠাৎ গানের জগত থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি সাফ বলেন, “রাজনীতি এখন সব জায়গায়। ভালো গান গাইলেই টিকে থাকা যায়, এমন নয়। আমরাও সেই রাজনৈতিক খেলায় এক সময় শিকার হয়েছি।”
“আমার গানই গেয়েছেন আশা ভোঁসলে?”
এই নিয়ে গুঞ্জন অনেক দিন ধরেই। তাই সাংবাদিকরা সরাসরি প্রশ্ন করলেন— আপনার গান কি আশা ভোঁসলে গেয়েছিলেন? উত্তরে কিছুটা মুচকি হেসে বলেন, “আমি শুনেছি। তবে নিজে চোখে দেখিনি, তাই কিছু বলব না।”
“তখন তোমার একুশ বছর…” গাইলেন সরাসরি সবশেষে, সাংবাদিকদের অনুরোধে নিজের প্রিয় গান “তখন তোমার একুশ বছর…” গেয়ে শোনালেন আরতি মুখোপাধ্যায়। মুহূর্তেই ঘর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল স্বর্ণযুগের সুরের আবহ।
আরও পড়ুনঃ ‘উনি নিজেকে সুচিত্রা সেন না ভাবলে আরও ভালো অভিনেত্রী হতেন…. ওভারঅ্যাক্টিং করতেন!’ মহানায়িকা হওয়ার যোগ্য নন সুচিত্রা সেন! বিস্ফোরক মন্তব্য অভিনেত্রী লিলি চক্রবর্তীর
আরতি মুখোপাধ্যায় শুধুই একজন গায়িকা নন, তিনি বাংলার গানের ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়। তার কণ্ঠ এখনো প্রমাণ করে দেয়, ভালো সংগীতের কোনও বিকল্প হয় না। তাকে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কুর্নিশ।





