শীতের রোদ গায়ে মেখে বসে ছিলেন কবীর সুমন। হঠাৎ এক পুরনো ছবি এসে পড়ল হাতে—মায়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনে তোলা। সেই ছবিটা দেখেই যেন স্মৃতির ঢেউ আছড়ে পড়ল মনে। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের সেই আবেগ-ভেজা মুহূর্তটা শেয়ার করলেন তিনি। বললেন, “মায়ের সঙ্গে আমার ছবি খুব কম। এই ছবিটা কে যেন পাঠিয়েছে আমায়। সেই কবে আমেরিকায় তোলা। ১৯৮০ সালে ভিওএ’র চাকরি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। মূর্খ তাই চাকরি ছেড়ে ফিরে এসেছিলাম।”
মা-কে নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণ যেন একটা পূর্ণ দৈর্ঘ্যের কাব্য। “অসামান্য এক মহিলা ছিলেন আমার মা। সারাজীবন স্বাধীনচেতা, বেপরোয়া। কাউকে তোয়াক্কা করতেন না। জন্ম থেকেই স্বাধীন। বই ছাড়া কিছু বুঝতেন না। সাত-আট বছর বয়স থেকে আমাকে স্বাবলম্বী হওয়ার পাঠ দিতে শুরু করেন। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সে চাকরি করতেন। কোনওদিন ‘মা মা’ করিনি আমি। ছিলেন মার্ক্সিস্ট, সিপিআইএমের সমর্থক, পরে নকশালপন্থী। তবে জ্যোতি বসুর সোজাসাপটা কথার ছিলেন দারুণ ভক্ত।”
গানওয়ালার মায়েরও কিন্তু গানের সঙ্গে গভীর যোগ ছিল। “সুগায়িকা ছিলেন মা। চল্লিশের দশকে বেতারে গান গাইতেন। গ্রামোফোন রেকর্ডও ছিল তাঁর। বাবা নজরুল ইসলামের সুপারিশে আকাশবাণীতে চাকরি নেওয়ার পর দু’জনে মিলে বেতারে গান গাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন নীতিগত কারণে। মা অভিনয়ও করতেন। ‘রক্তকরবী’র এক বিখ্যাত মঞ্চায়নে নন্দিনী ছিলেন মা আর বিশু পাগল ছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস। তখনই দু’জনের মধ্যে কিঞ্চিৎ প্রেমও ছিল বলে মনে হয়। প্রথমবার চীনে গান গাইতে গিয়ে দেবব্রতবাবু মার জন্য উপহার এনেছিলেন—কাঁচের পুতুল। এমন মানুষ তিনি।”
সুমনের লেখায় উঠে আসে সেই সময়ের সমাজচিত্রও। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে তাঁর যৌবনকাল পর্যন্ত, মা ছিলেন নিজের মত করে জীবন যাপন করা একজন স্বাধীন নারী। “মা খোলাখুলি তাঁর পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে ডেট করতেন। বাবা কোনওদিন অসুবিধে করেননি। ছেলেবেলা থেকে যৌবন পর্যন্ত মা-বাবাকে চুমু খেতে দেখেছি—লুকিয়ে নয়, প্রকাশ্যে। আমার সামনেই আদর করতেন তাঁরা।”
নিজের নাম বদলানোর পর যখন চারিদিকে নানা মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে, তখনও মায়ের সাহসী জবাব ছিল অটল। “অনেকে মাকে ফোন করে বলেছিল, ‘আপনার ছেলে তো মুসলমান হয়ে গেল!’ মা বলতেন, ‘আমার ছেলে বলেই তো হলো, নইলে কি তোমার বাবা হবেন?’” কবীর সুমন বলেন, তাঁর মা একসময় এক মুসলমান তরুণের প্রেমেও পড়েছিলেন, বিয়ের কথাও উঠেছিল। কিন্তু হঠাৎই সেই গল্পে ঢুকে পড়েন গায়ক সুধীন্দ্রনাথ। ব্যারিস্টার যুবকটির সঙ্গে সম্পর্ক আর হয়নি।
আরও পড়ুনঃ ‘জমানো সঞ্চয়ও ফুরিয়ে আসছে, এভাবে চললে আ’ত্মহত্যা ছাড়া রাস্তা থাকবে না’ রূপঙ্করের তীব্র ক্ষোভ
এইভাবেই, একটা মায়াবী আলোয় স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে সেই শীতের দুপুর। মায়ের উপস্থিতি এখনও টের পান সুমন। “মা মাঝে মাঝে আসেন। দেখতে পাই না, কিন্তু বুঝি তিনি এসেছেন। গান শুনতে চান। পাশের বাড়ির তিন তলায় একটা ছেলে বাঁশি শেখে। তার রেয়াজের সুর এ পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। জয় সুর।” এ যেন এক দীর্ঘ চিঠি… মায়ের উদ্দেশে, যাঁর প্রেরণায় কবীর সুমনের গানের প্রতিটি সুরে আজও জেগে ওঠে এক অভ্যন্তরীণ বিপ্লব।





