বলিউড এমন শূন্যতা অনেক দিন দেখেনি। পর্দার করিশমা আর বাস্তব জীবনের সরলতায় যিনি লক্ষ-কোটি মানুষের মন জয় করেছিলেন, সেই ধর্মেন্দ্র আজ আর নেই। ১৯৭৫ সালে তাঁরই অভিনীত ছবির সংলাপ যেন আজ জীবন্ত হয়ে উঠেছে – “মর জায়ুঙ্গা তো লোগ রোয়েঙ্গে, জিন্দা রাহু তো লোগ জালতে রহেঙ্গে।” তিনি হয়তো সেটাই বুঝেছিলেন জীবনের দীর্ঘ পথ চলায়। ভালোবাসা পেয়েছেন অগণিত, হিংসাও কম নয়, তবু তাঁর চলে যাওয়া যেন এক নীরব ভূমিকম্প। তাঁর অসুস্থতার খবর ছড়িয়েছিল কিছুদিন ধরেই, চিকিৎসকেরাও জানিয়ে দিয়েছিলেন প্রস্তুত থাকতে। কিন্তু মানুষ যখন কাউকে এত ভালোবাসে, তখন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশাটুকুই ভরসা। সোমবারের সকাল সেই আশার আলো নিভিয়ে দিল। খবর প্রথমে ফিসফিস করে ছড়ালেও, শ্মশানে পৌঁছনো হেমা মালিনীকে দেখেই যেন সকলের বুক কেঁপে উঠল। মুহূর্তেই বুঝে গেলেন সকলেই – এবার খবরটা সত্যি।
নিভৃত শেষযাত্রা – ক্যামেরা থেকে দূরে নীরব বিদায়
ধর্মেন্দ্রর বিদায় যেন তাঁর ব্যক্তিত্বেরই প্রতিচ্ছবি – সৌম্য, গভীর, বিনয়ী। মৃত্যুর ভুয়ো খবর ছড়িয়ে তাঁর পরিবার অতীতে যে ভোগান্তির মুখোমুখি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হোক তা চাননি কেউ। তাই শেষযাত্রা আয়োজন করা হল নিভৃতেই। মিডিয়ার নজর এড়িয়ে, আলোচনার ঝলকানি ছাড়া, একেবারে সরলতার পথে যাত্রা করলেন বলিউডের এই কিংবদন্তি। একে একে পৌঁছলেন অমিতাভ বচ্চন, সলমন খান, সায়রা বানু, আমির খানসহ আরও বহু মুখ। তবু কোনও ঘোষণাহীন সেই শ্মশান যেন এক চলচ্চিত্রের দৃশ্য, যেখানে নায়ক নীরবে মঞ্চ ছাড়েন। পরিবারও সেই সিদ্ধান্তে অবিচল। কোনও অফিসিয়াল বিবৃতি নেই, নেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখার প্রয়োজনও। শুধু নিস্তব্ধতা, আর সম্মান – সেটাই ছিল শেষ আয়োজন। এমন সাদামাটা যাত্রাই যেন ধর্মেন্দ্রকে সবচেয়ে মানিয়েছে।
শ্মশানের নীরবতা – এক অনুচ্চারিত শোকের দিন
বলিউডের ইতিহাসে বহু অনুদ্ঘাটিত মুহূর্ত আছে, কিন্তু এই দৃশ্যটি নিঃসন্দেহে অনন্য। পরিবেশে অদ্ভুত নীরবতা, সেই নীরবতার মধ্যেই ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তারকার চোখে জল। অনেকে মুখ লুকিয়েছেন, কেউ সানগ্লাসের আড়ালে লুকিয়েছে ভেঙে পড়া অনুভূতি। ধর্মেন্দ্র শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন ইন্ডাস্ট্রির শিষ্টাচারের জীবন্ত উদাহরণ। তাঁর বন্ধুত্ব, তাঁর আচরণ, তাঁর হাসি—সবই ছিল সহজ, স্বাভাবিক, নিরাভরণ। তাই তাঁর প্রয়াণ এতটা ব্যক্তিগত হয়ে দাঁড়িয়েছে সকলের কাছে। হেমা মালিনী শোকার্ত, চোখ ভিজে। তাঁর মেয়েরা একদিকে মা-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, অন্যদিকে সামলাচ্ছেন শোকগ্রস্ত পরিবেশ। শ্মশানে আলো ছিল, ক্যামেরা ছিল, কিন্তু যেটা ছিল না তা হলো শব্দ। কেবল শোক, স্মৃতি আর নিঃশব্দ শ্রদ্ধা।
অস্থি যাত্রার দৃশ্য – জনতার চোখে জল, রাস্তায় নীরবতা
বিকেলের আলো ফিকে হয়ে আসতেই দেখা গেল এক অ্যাম্বুলেন্স মুম্বইয়ের ব্যস্ত রাস্তায় দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ভিতরে ধর্মেন্দ্রর অস্থি। আশ্চর্যের বিষয়, সেই গাড়িতে পরিবারের কেউ ছিলেন না। হয়তো এটা সিদ্ধান্ত ছিল সাদামাটা রাখার, অথবা শোককে আর প্রচারের আলোয় না নিয়ে যাওয়ার। সংবাদমাধ্যম গাড়িটির পিছনে ছুটছে, কিন্তু যেন সকলেই জানে—এ যাত্রা কেবল ধর্মেন্দ্রর। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দেখা গেল সানি দেওলকে, মুখে গভীর ব্যথার ছাপ। অন্যদিকে হেমা মালিনী জানালার আড়াল থেকে হাত জোড় করে ধন্যবাদ জানালেন মিডিয়াকে—না প্রচারের জন্য, বরং সম্মান বজায় রাখার জন্য। তাঁর মুখে কথা নেই, চোখে শুধু অশ্রু আর নিয়তির কাছে নীরব আত্মসমর্পণ।
আরও পড়ুনঃ হারের কান্না থেকে রাজকীয় কামব্যাক—শাহরুখের জীবনের সিনেমাটিক গল্প
শেষ অধ্যায় – মানুষ যাবে, সৃষ্টি থাকবে
ধর্মেন্দ্র ছিলেন সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া অসাধারণ মানুষ। খ্যাতির শিখরে পৌঁছেও তিনি মাটির মানুষ হয়ে থেকেছেন সারাজীবন। তাঁর অভিনয়, তাঁর ডায়লগ, তাঁর স্টাইল—সবই বলিউডের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি দর্শকদের ভালোবাসা নিয়ে বাঁচেছেন। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর সিনেমা, তাঁর উত্তরাধিকার থাকবে চিরকাল। স্মৃতি কখনও মুছে যায় না, আর কিংবদন্তিরা কখনও সত্যিই মারা যান না। তাঁদের গল্প, তাঁদের শিল্প, তাঁদের উপস্থিতি—সময়ের স্রোত পেরিয়েও বেঁচে থাকে। ধর্মেন্দ্রও থাকবেন, পর্দায়, মানুষের হৃদয়ে, আর বলিউডের সোনালি অধ্যায়ে।





