‘বাবা যে কত বড় তারকা, তা কোনোদিন বুঝতেই পারিনি!’ বিখ্যাত উদয়-অমলা শঙ্করের মেয়ে হয়েও ছিল না পকেট মানি, মাটির কাছাকাছি থাকার রহস্য ফাঁস করলেন মমতা শঙ্কর!

ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য এবং সমান্তরাল চলচ্চিত্রের জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন মমতা শঙ্কর (Mamata Shankar)। কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর এবং অমলা শঙ্করের কন্যা হিসেবে তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই শিল্পের আবহে বড় হওয়া মমতা শঙ্কর কেবল একজন দক্ষ নৃত্যশিল্পীই নন, বরং সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন এবং ঋতুপর্ণ ঘোষের মতো বিশ্বখ্যাত পরিচালকদের প্রিয় অভিনেত্রীও বটে। বর্তমানে তিনি নিজের ডান্স কোম্পানি ‘উদয়ন’-এর মাধ্যমে উদয় শঙ্কর ঘরানার নৃত্যশৈলীকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের কেরিয়ারে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত এই শিল্পী আজও তাঁর পরিশীলিত অভিনয় এবং মার্জিত ব্যক্তিত্বের জন্য দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

সম্প্রতি একটি ডিজিটাল সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশবের দিনগুলো নিয়ে স্মৃতিচারণা করেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী। তিনি জানান, বিশ্বজুড়ে তাঁর বাবার যে বিপুল খ্যাতি ছিল, তা ছোটবেলায় তাঁর কাছে ছিল একেবারেই অজানা। মমতা শঙ্করের কথায়, “আমরা ছোটবেলা থেকে কোনোদিন বুঝতে পারিনি যে আমাদের পরিবার বিশেষ কিছু। বাবা-মা আমাদের কোনোদিন বুঝতেই দেননি যে তাঁরা আলাদা কেউ বা তাঁরা দেশ-বিদেশে এত নাম করেছেন।” খ্যাতির চাকচিক্য বা আভিজাত্যের চেয়ে এক সাধারণ পারিবারিক মূল্যবোধের মধ্যেই বড় হয়েছেন তিনি, যা আজও তাঁর চলনে-বলনে স্পষ্ট।

পারিবারিক আবহের কথা বলতে গিয়ে মমতা শঙ্কর একটি মজার অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন। তিনি জানান, যখন দেখতেন তাঁর বাবাকে দেখার জন্য বাড়ির সামনে বা রাস্তায় মানুষের ভিড় জমছে, তখন তিনি বিষয়টিকে খুব সাধারণভাবেই নিতেন। তাঁর মনে হতো, বোধহয় জগতের নিয়মই এমন সবার বাবা-মাকেই হয়তো এভাবেই বাইরের মানুষ দেখতে আসে। উদয় শঙ্কর এবং অমলা শঙ্কর অত্যন্ত সচেতনভাবেই সন্তানদের প্রচারের আলো থেকে দূরে রেখেছিলেন, যাতে তাঁরা স্বাভাবিক এবং মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের মতো বড় হতে পারেন। এই সরল বিশ্বাসই মমতাকে আজীবন নিরহংকারী থাকতে শিখিয়েছে।

আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং মিতব্যয়িতার বিষয়েও মুখ খুলেছেন তিনি। মমতা শঙ্কর জানান, তাঁর স্কুলের বন্ধুদের অনেকের কাছেই প্রচুর পকেট মানি থাকত, যা দিয়ে তারা অনেক শৌখিন জিনিস কিনত। কিন্তু মমতা শঙ্কর এবং তাঁর ভাইদের ক্ষেত্রে নিয়ম ছিল একেবারেই আলাদা। তাঁদের কোনোদিন অতিরিক্ত পকেট মানি দেওয়া হতো না। বিলাসিতার বদলে জীবনের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিতে শিখেছিলেন তাঁরা। সমসাময়িক সহপাঠীদের তুলনায় আর্থিক সুযোগ-সুবিধা কম থাকলেও, সেই অভাববোধই তাঁদের জীবনের কঠিন বাস্তবকে চিনতে শিখিয়েছিল।

পরিশেষে, মমতা শঙ্করের এই বক্তব্য বর্তমান সময়ের ‘স্টার কিড’ সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে এক বড় শিক্ষা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বড় মাপের শিল্পী হওয়ার প্রাথমিক শর্ত হলো একজন ভালো এবং সাধারণ মানুষ হওয়া। খ্যাতির চূড়ায় থেকেও কীভাবে পা মাটিতে গেঁথে রাখতে হয়, তা তিনি তাঁর বাবা-মায়ের কাছ থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। আধুনিক চাকচিক্যময় জীবনের ভিড়ে মমতা শঙ্করের এই সরল জীবনদর্শন এবং শৈশবের গল্পগুলি কেবল তাঁর অনুরাগীদের জন্যই নয়, বরং সুস্থ সমাজ গঠনেও অনুপ্রেরণা যোগায়।