‘রাহুলকে কোনোদিন এত ঠান্ডা দেখিনি!’ মতাদর্শ আলাদা হলেও অটুট ছিল বন্ধুত্ব, রাহুলের শেষ ফোন আজও কানে বাজছে রুদ্রনীল ঘোষের!

পশ্চিমবঙ্গের বিনোদন জগতের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Banerjee) অকাল প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে স্টুডিও পাড়ায়। গত ২৯শে মার্চ উড়িষ্যার তালসারি সমুদ্র সৈকতে একটি শুটিং চলাকালীন মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনায় জলে ডুবে মৃত্যু হয় ৪৩ বছর বয়সী এই অভিনেতার। ‘ভোলেনাথ পার করেগা’ নামক একটি ধারাবাহিকের কাজে সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই টলিউডের সহকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ অনুরাগীদের মধ্যে স্তব্ধতা নেমে আসে। রাহুলের দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং সহ-অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ (Rudranil Ghosh) তাঁর প্রিয় বন্ধুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।

রাহুলের বাসভবনে গিয়ে তাঁর শোকার্ত পরিবারের সাথে দেখা করেন রুদ্রনীল। স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে তিনি জানান যে, রাহুলকে তিনি কোনোদিন এত শান্ত ও শীতল অবস্থায় দেখেননি। রুদ্রনীল স্মরণ করেন তাঁদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের কথা, যেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় কখনো চির ধরেনি। রাহুলের মা যখন তাঁর মেধাবী ছেলের শোকে পাথর হয়ে বসেছিলেন, তখন রুদ্রনীলও নিজেকে সামলাতে পারেননি। তিনি জানান, রাহুলের সাহস ছিল নিজের ভুল স্বীকার করার, যা বর্তমান সময়ে বিরল। কদিন আগেই তাঁদের পডকাস্টের সাফল্যের খবর রাহুলই তাঁকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, অথচ সেই কণ্ঠ আজ চিরতরে স্তব্ধ।

এই মর্মান্তিক মৃত্যু টলিউডের অন্দরে নিরাপত্তার অভাব নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, হাঁটু সমান জলে একটি নাচের দৃশ্যের শুটিং করার সময় হঠাৎই রাহুল ও অন্য এক কর্মী গভীর খাতে পড়ে যান। যদিও অন্যজনকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে, কিন্তু রাহুলকে ফেরানো যায়নি। ওয়েস্ট বেঙ্গল মোশন পিকচার্স আর্টিস্ট ফোরামের পক্ষ থেকে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ও শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, শুটিং সেটে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকলে হয়তো এই দুর্ঘটনা এড়ানো যেত।

রাহুলের স্ত্রী, অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার ইতিমধ্যেই উড়িষ্যা পুলিশে একটি এফআইআর দায়ের করেছেন এবং শিল্পী সংসদের পক্ষ থেকেও প্রযোজনা সংস্থার কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে এবং শিল্পী ও কলাকুশলীদের নিরাপত্তার দাবিতে গত ৭ই এপ্রিল থেকে টলিপাড়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। টেকনিশিয়ান স্টুডিও থেকে রাধা স্টুডিও পর্যন্ত এক শোকমিছিলের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে প্রত্যেকের হাতে ছিল ‘জাস্টিস ফর রাহুল’ লেখা প্ল্যাকার্ড। প্রিয় অভিনেতার এমন মৃত্যু যে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যাচ্ছে না, তা টলিউডের এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদেই স্পষ্ট।

রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় জীবন শুরু হয়েছিল ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবির মাধ্যমে, যা তাঁকে রাতারাতি জনপ্রিয়তা দিয়েছিল। এরপর তিনি অসংখ্য সিনেমা ও ধারাবাহিকে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর মৃত্যু শুধু তাঁর পরিবার বা প্রিয়াঙ্কা সরকার ও তাঁদের পুত্রের জন্য ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং বাংলা চলচ্চিত্র জগতের জন্য এক অপূরণীয় শূন্যতা। রুদ্রনীল ঘোষের কথায়, রাহুলের মতো একজন জ্ঞানী ও সাহসী মানুষকে হারিয়ে ইন্ডাস্ট্রি এক অভিভাবকহীন অবস্থায় পড়ল। এখন দেখার, এই আন্দোলনের ফলে ভবিষ্যতে শুটিং সেটে কাজের পরিবেশ এবং নিরাপত্তা কতটা উন্নত হয়।