‘টলিউডে এখন কোনো বিনিয়োগই নেই, প্রায় বন্ধ ইন্ডাস্ট্রি!’ ‘অভিনয় কি আদেও শেখানো যায়?’ টলিউডের খরা কাটাতে সম্পূর্ণ নতুন ভাবনা নিয়ে হাজির তথাগত মুখোপাধ্যায়!

তথাগত মুখোপাধ্যায় (Tathagata Mukherjee) বাংলা বিনোদন জগতের অত্যন্ত পরিচিত ও প্রতিভাবান একটি নাম। আশুতোষ কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর থিয়েটারের হাত ধরে তাঁর অভিনয় জীবনের শুরু। পরবর্তীতে স্টার জলসা, জি বাংলার মতো জনপ্রিয় চ্যানেলের একাধিক মেগা সিরিয়ালে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রতিটি বাঙালি ঘরের প্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন। তবে শুধু অভিনয়ের চারচৌহদ্দিতে নিজেকে আটকে রাখেননি তথাগত। ক্যামেরার পিছনের জাদুকর হিসেবেও তিনি নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। ‘ইউনিকর্ন’, ‘ভটভটি’ এবং সাম্প্রতিক ‘পারিয়া’-র মতো প্রশংসিত ও ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্র পরিচালনা করে তিনি টলিউডে পরিচালক হিসেবে নিজের এক স্বতন্ত্র আসন তৈরি করেছেন। স্পষ্টবক্তা এবং আপসহীন মানুষ হিসেবে পরিচিত এই শিল্পী অভিনয়ের পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখিও করেন।

সাক্ষাৎকারে টলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান চরম দুর্দশা নিয়ে তথাগতর বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি অত্যন্ত সহজ ভাষায় ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের কঙ্কালসার রূপটি সাধারণ মানুষের সামনে নিয়ে এসেছেন। তথাগত দাবি করেন, বর্তমানে টলিউডে কোনো নতুন বিনিয়োগ বা ইনভেস্টমেন্ট নেই, যার কারণে সিনেমা তৈরির কাজ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে রয়েছে। শুধুমাত্র কিছু টেলিভিশন সিরিয়ালের ওপর ভর করে ইন্ডাস্ট্রি কোনোমতে টিকে আছে। এমনকি তাঁর নিজেরও দুটি বড় চলচ্চিত্রের কাজ এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ আটকে রয়েছে। রাজনৈতিক পালাবদল বা ডামাডোলের কারণে প্রযোজকরা টাকা ঢালতে ভয় পাচ্ছেন। এই তীব্র আর্থিক সংকটের কথা এভাবে প্রকাশ্যে কোনো প্রথম সারির পরিচালকের মুখে এর আগে তেমন একটা শোনা যায়নি।

চলচ্চিত্র পরিচালনা করতে গিয়ে একজন স্বাধীনচেতা পরিচালককে কতটা নোংরা রাজনীতির শিকার হতে হয়, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তথাগত। তিনি জানান, বহু প্রযোজক সিনেমা বোঝেন না, কিন্তু টাকা দেওয়ার অহংকারে তাঁরা গল্প, হিরো-হিরোইন নির্বাচন থেকে শুরু করে আইটেম গান রাখার মতো বিষয়েও খবরদারি করতে আসেন। তথাকথিত এই ‘অসুস্থ পরিবেশের’ কারণে পরিচালকদের নিজের সৃজনশীলতা বিসর্জন দিতে হয়। তবে তথাগত সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আর পাঁচজনের মতো প্রযোজকদের অন্যায় আবদার বা হিরোদের তর্জনী সহ্য করে ছবি বানাতে পারবেন না। দরকার হলে তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট বা স্বাধীনভাবে নিজের শর্তে সিনেমা বানাবেন, তবুও সিনেমার গুণগত মানের সাথে কোনো আপস করবেন না।

সাক্ষাৎকারের অন্যতম আকর্ষণীয় এবং প্রশংসনীয় দিক ছিল তথাগতর গভীর আত্মবিশ্লেষণ। একজন পুরুষ হিসেবে সমাজে জন্ম নেওয়ার কারণে তিনি যে নারীদের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা বা প্রিভিলেজ পেয়ে বড় হয়েছেন, তা তিনি বিনাদ্বিধায় স্বীকার করেছেন। তথাগত জানান, একটা মেয়েকে রাতে বের হতে গেলে বা পোশাক পরার আগে যেখানে দশবার ভাবতে হয়, একজন পুরুষ হিসেবে তাঁকে কখনোই সেই লড়াইটা করতে হয়নি। একই সাথে তিনি সমাজ ও নিজের ভেতরের মেল গেজ এবং স্লাট শেমিং বা নারীর পোশাক নিয়ে নোংরা মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অনেক সময় নারীরাই অন্য একজন নারীর স্বাধীনতা বা রূপ দেখে হিংসায় অন্ধ হয়ে স্লাট শেমিং করেন, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। প্রকৃত নারী স্বাধীনতা বা লিঙ্গসমতা বাসের সিটে বা মুখে বড় বড় কথা বলায় নেই, তা মানুষের চিন্তা-ভাবনায় থাকা উচিত।

ইন্ডাস্ট্রির এই খরা কাটানো এবং নতুনদের সঠিক দিশা দেখানোর জন্য তথাগত শুরু করেছেন জীবনের এক নতুন অধ্যায় তথাগত মুখার্জী ফিল্ম অ্যান্ড অ্যাক্টিং ল্যাব। এই উদ্যোগের বিস্তারিত জানাতে গিয়ে তিনি এক অভিনব দাবি করেন তাঁর মতে অভিনয় বা ফিল্ম মেকিং কোনো ক্লাসরুমে মুখস্থ করিয়ে শেখানো সম্ভব নয়। এটি সম্পূর্ণ নিজের যাপন এবং ভাবনার বিষয়। তথাকথিত অ্যাক্টিং ইনস্টিটিউটগুলোর মতো সকালবেলা উঠে ব্যায়াম করা বা গলার স্বর কাঁপানো এখানে শেখানো হবে না, বরং ক্যামেরার লেন্সকে বন্ধু বানিয়ে কীভাবে সম্পূর্ণ জড়তাহীন ও বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করা যায়, সেই মনস্তাত্ত্বিক খেলাটাই তিনি শেখাবেন। মাত্র ৫ বছর থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সের মানুষের জন্য তৈরি এই প্র্যাক্টিক্যাল ল্যাবটি আগামী দিনে টলিউডকে একঝাঁক নতুন ও খাঁটি প্রতিভাবান শিল্পী উপহার দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।