‘খ্যাতির লোভ নয়, মানুষ হও’- বাবার জন্মদিনে আবেগঘন স্মৃতি!

আজ বাবার জন্মদিন। বড় হওয়ার পর মানুষ উদয়শঙ্করকে চেনেন এক কিংবদন্তি শিল্পী হিসেবে, কিন্তু আমার কাছে তিনি সবসময়ই ছিলেন শুধু বাবা। ছোটবেলায় বাড়িতে হঠাৎ এত মানুষের ভিড় দেখে ভাবতাম, নিশ্চয়ই সব বাবাকেই সবাই এমন দেখতে আসে। ওঁর ভেতর কখনও তারকার অহংকার দেখিনি। আমার বাবা মা আমাদের বড় করেছেন একেবারে সাধারণভাবে, অতি স্বাভাবিক জীবনযাপনের মধ্যে দিয়ে। দাদা হস্টেলে থাকলেও আমি সারাক্ষণ বাবামায়ের সঙ্গে দেশ বিদেশ ঘুরেছি। পড়াশোনায় ক্ষতি হলেও জীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

বাবা মা আমাদের জন্য কোনও সম্পদ রেখে যাননি, রেখে গেছেন মানুষের মতো মানুষ হওয়ার মূল্যবোধ। বাবা বলতেন, “খ্যাতি আর টাকার দিকে তাকিয়ে দৌড়ো না ভাল মানুষ হলে সব নিজেই আসবে।” কখনো প্রচুর অনুষ্ঠান, আবার কখনো লম্বা বিরতি—এই ওঠাপড়ার মাঝেও আর্থিক টানাপড়েন আমাদের কখনও ছুঁতে দেননি। সচ্ছলতা আর অভাবের মাঝেও একটা সমতা বজায় রেখে আমাদের মানুষ করেছেন। তাই আজও আমার চাহিদা খুবই সীমিত।

মৃত্যুর আগে বাবা মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, “যা-ই হোক, নাচটা কখনও ছাড়িস না।” আমি জানি, নাচ আর অভিনয়ের ভিতরেই আমার সবচেয়ে বেশি শান্তি। এই ভালোবাসা বাবার থেকেই পাওয়া। আমার ছেলেদেরও আমি শিখিয়েছি মানুষকে শ্রদ্ধা করতে। মেয়ে থাকলেও একই শিক্ষা দিতাম কারণ পারস্পরিক সম্মানই মানুষকে বড় করে তোলে।

বাবার জন্মদিনকে কেন্দ্র করে শান্তিনিকেতনের সৃজনী শিল্পগ্রামে অনুষ্ঠিত হল উদয়শঙ্কর নৃত্য উৎসব। রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে বাইশটি দল অংশ নিয়েছে এই উৎসবে। বাবা বলতেন, “নাচে প্রাণ থাকতে হবে।” তাঁর নৃত্যশৈলী শেখাতে গিয়ে বুঝেছি এই শিল্প আসলে জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। যা জীবনে করা উচিত নয় তা নাচেও গ্রহণযোগ্য নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করেছি, এই নৃত্যশৈলী শুধু একটি কৌশল নয় বরং এক গভীর দার্শনিকতা।

আরও পড়ুনঃ ফিরে আসছে র‍্যাঞ্চো ফারহান রাজু! ১৬ বছর পর আসছে থ্রি ইডিয়টস ২!

আজও বাবাকে নতুন করে চিনছি। তাঁর ভাবনা তাঁর নাচ তাঁর আত্মা—সবই যেন প্রতিদিন নতুন রূপে সামনে আসে। নাচ মনকে শুদ্ধ করে মানুষকে একত্র করে এবং ভেতর থেকে শক্তি জোগায়। আমার ছাত্রছাত্রীরা আজ শিক্ষক হয়ে বাবার ধারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমার পুত্রবধূ দুজনও এই শৈলীকে আগলে রেখেছে। ঈশ্বর যেন তাঁদের হাতে বাবার শিল্পের আলো ছড়িয়ে দেন—এই বিশ্বাস নিয়েই আজও আমি এগিয়ে চলেছি।