কলকাতার এই বৃষ্টি শুধু জল নয়, আতঙ্ক নামিয়ে এনেছে শহরের রাস্তায়। ভোর রাত থেকে শুরু হওয়া মুষলধারে বৃষ্টি যখন অনেকের ঘুমের মধ্যে কেটে গিয়েছে, তখন কিছু মানুষ সামনাসামনি দেখেছেন প্রকৃতির ভয়াল রূপ। তাঁদের মধ্যে অন্যতম অভিনেতা-রাজনীতিবিদ কাঞ্চন মল্লিক। মাঝরাতে শ্যুটিং সেরে বাড়ি ফেরার পথে তিনি যে অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন, তা এককথায় দুঃস্বপ্নের মতো।
কাঞ্চন নিজের মুখেই জানিয়েছেন—“যে কোনও মুহূর্তে অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যেতে পারত।” তাঁর কথায় শোনা গেল আতঙ্ক আর ক্ষোভের মিশেল। রাত তিনটে নাগাদ যখন তিনি শ্যুটিং শেষ করে ফিরছিলেন, তখনই ঝেঁপে নেমেছিল মেঘভাঙা বৃষ্টি। সেই দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে কাঞ্চন বলেন, “এমন বৃষ্টি আমি জীবনে দেখিনি। যারা ঘুমিয়ে ছিলেন, তারা আন্দাজই করতে পারবেন না ঠিক কতটা জোরে বৃষ্টি হয়েছে। চোখের সামনে রাস্তা উধাও, শুধু জল আর অন্ধকার। মনে হচ্ছিল গাড়ি যেকোনো মুহূর্তে উল্টে যেতে পারে।”
প্রকৃতপক্ষে, কলকাতার মানুষ বরাবরই বৃষ্টির কষ্ট জানে। কিন্তু এবারের দুর্যোগের তীব্রতা নিয়ে কাঞ্চনের বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে প্রশাসনের প্রস্তুতি একেবারেই শূন্য ছিল। তিনি ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, “আমাদের ড্রাইভার রাতেই বাড়ি যেতে পারেননি। এত ভয়ানক অবস্থা যে, তাঁকে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। আর আমাদের বাড়িতে যারা প্রতিদিন সাহায্য করেন, তারাও কেউ আসতে পারেননি। এর মানে চারদিকেই বিপর্যয়।”
প্রশ্ন উঠছে, দুর্গাপুজোর আগে বারবার আবহাওয়া দফতর সতর্কতা জারি করলেও, শহর কেন এই বৃষ্টির কাছে অসহায়? এত বছরের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও কেন প্রতিবার একই ছবি দেখা যায়—রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়া, বিদ্যুৎ বিপর্যয়, মানুষ আটকে পড়া? কাঞ্চনের কথাতেই স্পষ্ট, এ শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা।
এই কঠিন পরিস্থিতির সাক্ষী হয়েছেন অভিনেত্রী শ্রীময়ীও। কাঞ্চনের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি সরাসরি বলেছেন, “যারা ছোট ব্যবসায়ী, তাদের জন্য খুব খারাপ লাগছে। এই কয়েকটা দিন ঘিরেই তারা সারা বছরের স্বপ্ন দেখে। সবকিছু ভেসে গেল।” তাঁর আক্ষেপ, নিজের বাড়িতেও প্রচুর কাজ বাকি ছিল, কিন্তু এই বিপর্যয় সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। “ভীষণ ঘেঁটে আছি, জানি না কী হবে,”—সরাসরি বললেন শ্রীময়ী।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। শহরের সাধারণ মানুষের মতো কাঞ্চন-শ্রীময়ীর মন্তব্যও আসলে প্রশাসনের প্রতি সরাসরি অভিযোগ। একদিকে শহর যখন উৎসবের মুখে সাজসজ্জায় ব্যস্ত, তখনই এই ভয়ঙ্কর বৃষ্টিতে সেই আনন্দ নিমেষে উবে গেছে। ছোট দোকানদার থেকে শুরু করে প্রতিদিনের খেটে খাওয়া মানুষ, সবার জীবনে নেমে এসেছে দুঃস্বপ্ন।
কাঞ্চনের বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই শহরে নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। মাঝরাতে একজন জনপ্রিয় মুখও যদি প্রাণ হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন, তাহলে সাধারণ মানুষ কতটা অসহায় অবস্থায় রয়েছেন, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়। প্রশ্ন উঠছে, আগামী দিনে যদি আরও এমন বৃষ্টি হয়, তবে কলকাতা আদৌ টিকে থাকবে তো?
আরও পড়ুনঃ ‘ও চলে যাওয়ার পর আমি শুনবো, আমায় জামা কিনে দেওয়ার কেউ নেই…’- কাছের মানুষের অকাল প্রয়াণ! রংহীন জীবন নিয়ে একাই লড়ছেন সুভদ্রা!
এক কথায়, কাঞ্চনের অভিজ্ঞতা শুধু একজন অভিনেতার ব্যক্তিগত আতঙ্ক নয়। এটি গোটা শহরের ব্যথা, যা আবারও প্রকাশ করল আমাদের অব্যবস্থাপনার নগ্ন সত্য। আর এই সত্যটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর।





