বাংলা চলচ্চিত্র জগতে সুন্দরী নায়িকাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। তিনি তার সৌন্দর্য আর অভিনয়ে মাতিয়ে তুলতেন দর্শকদের। তিনিই জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুমিত্রা দেবী (Sumitra Debi)। মাত্র ১৮টির মতো বাংলা ছবিতে অভিনয় করলেও তাতেই আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি। কলকাতার প্রেক্ষাগৃহে তার অভিনীত সিনেমাগুলো দেখা জন্য পড়ত লম্বা লাইন। যদিও অভিনয় জগতে আসার রাস্তা তার পক্ষে মোটেও সহজ ছিল না। নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে।
কেমন ছিল সুমিত্রা দেবীর অভিনয়ের পূর্ববর্তী জীবন?
১৯২৩ সালের ২২ জুলাই বীরভূম জেলার সিউড়িতে জন্ম হয় তার। অভিনেত্রীর প্রকৃত নাম ছিল নীলিমা চট্টোপাধ্যায়। তার পিতার নাম মুরালি চট্টোপাধ্যায়। অভিনেত্রীর বাল্যশিক্ষা সম্পন্ন হয় মুজাফফরপুরে। এরপর ১৯৩৪ সালে বিহারে ভূমিকম্পের জেরে অভিনেত্রীর পরিবার চলে আসে কলকাতায়। গোড়া ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মের ফলে অনেক নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তার ইচ্ছা ছিল রুপোলি পর্দার অভিনেত্রী হওয়ার। যৌবনকালে সবে পা রেখেছেন তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় নীলিমার রূপের প্রশংসা।

শ্বশুরবাড়িতে গৃহনির্যাতনের শিকার হন সুমিত্রা দেবী
তবে মেয়ে সিনেমা জগতে অভিনয় করতে চায় জেনে চিন্তায় পড়েন বাবা। ‘অভিনয় করা যাবে না’ কড়া ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাকে। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি বিশেষ। ফলে অল্পবয়সেই অভিনেত্রীর বিয়ে দিয়ে দেয় তার বাবা। বিয়ের পর অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিলেন নীলিমা দেবী। স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে সংসার করতে চেয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু শ্বশুরবাড়ির লোকের অত্যাচার বাড়ছিল দিন দিন। স্বামীর অত্যাচার অসহনীয় হয়ে উঠেছিল তার পক্ষে। অত্যাচার সইতে না পেরে স্বামীর ঘর ছেড়ে একদিন বেরিয়ে এলেন তিনি।
দ্বিতীয়বার কাকে বিয়ে করেছিলেন সুমিত্রা দেবী?
সংসার থেকে বেরিয়ে আসার পর ফের অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন ডানা বাঁধে তার মনে। নিজের ছবি সহ আবেদনপত্র জমা দেন নিউ থিয়েটারসে। তারপর সাক্ষাৎকার দিয়ে সফল হন অভিনেত্রী। শুরু হয় অভিনয় জগতে তার পথ চলা। সাদা কালো পর্দায় আর নীলিমা নয়, তার নাম হল সুমিত্রা দেবী। নিউ থিয়েটারসে মাই সিস্টার সিনেমায় নায়িকা হিসেবে তিনি নির্বাচিত হলেও তার প্রথম মুক্তি প্রাপ্ত ছবি ছিল সন্ধি। প্রথম ছবিতেই দর্শকদের মন জয় করে নেন তিনি। প্রথম ছবিতে আসার পর তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন অভিনেতা দেবী মুখোপাধ্যায়কে। সেইসময় দেবী মুখোপাধ্যায় ছিলেন বিরাট মাপের অভিনেতা। বিএফজেএ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন: এই ক’ঠিন পরীক্ষায় দীপার পাশে দাঁড়ালো সূর্য! সেনগুপ্ত বাড়িতে ফিরে এলো ইরা!
ছেলের জন্মের ১০ দিনের মাথায় স্বামীকে হারান সুমিত্রা দেবী
১৯৪৬ সালে দেবী মুখোপাধ্যায়কে বিয়ের পর তাদের এক পুত্র সন্তান হয়, নাম বুলবুল। সুমিত্রা দেবী ভেবেছিলেন দ্বিতীয়বার বিয়ের পর স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে শান্তিতে সংসার করবেন কিন্তু কপালের লিখন খণ্ডাবে কে? বুলবুল জন্মানোর ১০ দিনের মাথায় প্রয়াত হন স্বামী। সদ্যজাত সন্তানকে নিয়ে অথৈ জলে পড়লেন মা সুমিত্রা দেবী। সেইসময় একা হাতে সবকিছু সামলে ছিলেন তিনি। তবে অভিনয় ছাড়েননি কখনও। তার সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘অভিযোগ’, ‘জয়যাত্রা’, ‘পথের দাবী’, ‘প্রতিবাদ’, ‘দস্যু মোহন’, ‘দেবী চৌধুরানী’, আধারে আলো’ উল্লেখযোগ্য। তাছাড়াও তিনি কাজ করেছেন বেশ কয়েকটি হিন্দি সিনেমায় তার মধ্যে ‘ময়ূরপঙ্খ’, ‘মমতা’, ‘দিওয়ানা’ উল্লেখযোগ্য। জানা গেছে জীবনের শেষবয়সে এসে সুমিত্রা দেবী বিবাহ করেছিলেন মুম্বাইয়ের এক ব্যবসায়ীকে। ১৯৯০ সালে ২৮ আগষ্ট সেই স্বামীর পরিচয় নিয়েই মারা যান অভিনেত্রী। তবে আজও বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমা কর্নিশ জানায় অভিনেত্রীকে। নিজের অভিনয়ের কারণে আজও দর্শকদের মাঝে স্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি।





