বাবা ছেলের মধ্যে দূরত্ব, অভিমান! কিসের দ্বন্দ্ব ছিল তাদের মাঝে? ছেলে প্রসেনজিতের ভালবাসায় ভালো আছেন তো বিশ্বজিৎ?

সে দিনটা আজও যেন চোখে ভাসে। মুভিটোন স্টুডিয়োয় শুটিং চলছে। নায়িকা সন্ধ্যা রায়, সঙ্গে তরুণ কুমার। হঠাৎ খবর এল—আরজি কর হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছে, বিশ্বজিতের ঘরে এসেছে নতুন প্রাণ। ছেলের জন্মের খবর শুনে পর্দার নায়ক তখন বাস্তব জীবনের বাবা! টেলিফোন ধরতে সেট থেকে গেট পর্যন্ত দৌড়েছিলেন তিনি। মা ও সন্তান দু’জনেই ভালো আছে শুনে বুকের ভিতর আনন্দের ঢেউ উঠেছিল। অভিনয়ে মন বসছিল না, বারবার টেক নিতে হচ্ছিল। শেষে তরুণ কুমার মজার ছলে বলেছিলেন, “মিষ্টি খাওয়াও!” রাজভোগ এনে পুরো ইউনিটের সঙ্গে সেই আনন্দ ভাগ করে নিয়েছিলেন নতুন বাবা।

রাতে হাসপাতালে গিয়ে ছেলের মাথায় হাত রেখে একটাই প্রার্থনা করেছিলেন বিশ্বজিৎ—“ও যেন একদিন নম্বর ওয়ান হয়।” হয়তো সেই আশীর্বাদই সত্যি হয়েছিল। ছোট থেকেই বুম্বা ছিল সবার আদরের। বিশ্বজিতের দেওয়া সেই নামই পরে বাংলা সিনেমার এক ইতিহাস হয়ে ওঠে। খুদে বয়সেই ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’ ছবিতে অভিনয় করে নজর কাড়ে সে। তারপর একে একে ‘রক্ততিলক’, ‘রাহগীর’—সবখানেই নিজের ছাপ রেখে গেল ছোট্ট বুম্বা।

তবে সময়ের সঙ্গে কাজের চাপ বাড়তে থাকল। কলকাতা, মুম্বই, দক্ষিণ—তিন দিকেই ছুটে বেড়াতেন বিশ্বজিৎ। সন্তানদের সময় দেওয়ার মতো অবকাশ ছিল না। তবু বুম্বা কখনও অনুযোগ করেনি। শান্ত, সংযমী স্বভাব। খাওয়াদাওয়ায়ও অদ্ভুত সংযম—শসা আর টকদইতেই চলে যেত। সেই সময় হয়তো বোঝেননি, কিন্তু ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল বাবা-ছেলের মধ্যে।

এক সময় মুম্বইয়ে স্থায়ীভাবে চলে যান বিশ্বজিৎ। আর বুম্বা ও মাকু (পল্লবী চট্টোপাধ্যায়) থেকে যায় কলকাতায়, মা রত্না চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। নতুন জীবনে পা রেখেও ছেলের টান ভুলতে পারেননি অভিনেতা। জন্মদিনে ফোন, উপহার—সবই করতেন, কিন্তু তাতে কি দূরত্ব কমে? অভিমান জমতে থাকল দুই প্রজন্মের মধ্যে। মাঝেমধ্যে বুম্বাকে নিজের কাছে নিয়ে শুটিং করতেন, তবুও মনের দূরত্বটা রয়ে গিয়েছিল।

আজ সেই সময় বদলেছে। অভিমান, অনুযোগ সব পেরিয়ে এসেছে এক মায়াময় সম্পর্ক। চোখে সমস্যা হলে বুম্বা নিজে এসে বাবাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায়, যত্ন করে পাশে থাকে। বিশ্বজিতের কথায়, “ছেলের মতো ছেলে হয়েছে ও।” এখন তিনি বুম্বার দায়িত্বে নিরাপদ, শান্তিতে। বরং ছেলের মধ্যে দেখতে পান উত্তমকুমারের ছায়া—ইন্ডাস্ট্রির প্রতি দায়বদ্ধতা, সহকর্মীদের প্রতি যত্ন, সবার পাশে থাকা মনোভাব। একটাই আক্ষেপ তাঁর—“ও যদি বলিউডে আসত, আজ হিন্দি ছবিরও প্রথম সারিতে থাকত।” তবু দিনশেষে গর্বই ভরে ওঠে বিশ্বজিতের কণ্ঠে। কারণ তাঁর প্রার্থনার মতোই, বুম্বা সত্যিই হয়েছেন “নম্বর ওয়ান”—শুধু পর্দায় নয়, মানুষের মনেও।