অনাথ আশ্রম থেকে রূপালী পর্দার রাজপথ, যাঁর জীবনে ব্যর্থতা ছিল সিঁড়ি, সাফল্য শুধু মাইলফলক- সুখেন দাস ছিলেন এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা

একটা নাম, এক অদম্য লড়াই, এক ভাঙাগড়ার গল্প—সেই নামই ‘সুখেন দাস’। আজ ২৮ জুলাই, তাঁর জন্মদিনে চলুন একটু ফিরে দেখা যাক, এক রুদ্ধশ্বাস জীবনযাত্রার সেই পথচলা, যা অন্ধকার থেকে আলোয় পৌঁছেছিল শুধুই সাহস, জেদ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির উপর ভর করে।

কথাটা শুরু হোক বউবাজারের সেই পুরনো গলি থেকে—‘শ্রীনাথ দাস লেন’। আজও নামটা টিকে আছে, কারণ এই গলির সঙ্গেই জড়িয়ে এক উজ্জ্বল ইতিহাস। উনিশ শতকের এক নামজাদা আইনজীবী ছিলেন শ্রীনাথ দাস—সুখেন দাসের ঠাকুরদা। আদি বাড়ি ছিল হালিশহরে, তবে কলকাতায় এসে রাজকীয় দুর্গাদালান-সহ একাধিক বাড়ি বানিয়ে ফেলেছিলেন তাঁর বাবা রামলোচন দাস। সেই দুর্গাদালান আজও দাঁড়িয়ে আছে, আর প্রতি বছর সেখানে হয় দুর্গাপূজা।

শ্রীনাথ নিজে আইনজীবী হলেও তাঁর ছেলেরা টান পান নাটকের প্রতি। কেউ হয়ে ওঠেন থিয়েটারের বিদ্রোহী কণ্ঠ—যেমন উপেন্দ্রনাথ দাস, যিনি ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে নাটক লিখে জেলও খেটেছেন। আবার সুখেনের বাবা, ফণীন্দ্রনাথ দাস, জীবনটাই দিয়েছিলেন নাটকের পেছনে। কিন্তু শিল্পে ডুবে গিয়ে হারিয়েছিলেন সব কিছু—কলকাতার নয়টা বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল দেনার দায়ে। আর এর পর একের পর এক ধাক্কা—হৃদরোগে বাবার মৃত্যু, তারপর মায়েরও। বাড়ির ছাদ হারিয়ে শিশুসুখেন ও তাঁর ভাইবোনেরা আশ্রয় পান অনাথ আশ্রমে।

তবে, আশ্রমের দেওয়াল বেশি দিন আটকে রাখতে পারেনি ছোট্ট সুখেনকে। একদিন পালিয়ে এল সে। রাস্তাই তখন তাঁর ঠিকানা। কখনও ফুটপাথ, কখনও রেস্টুরেন্টের থালা ধোয়ার কাজ, খাবারের বিনিময়ে বেঁচে থাকা। ঠিক সেই সময়ই ধর্মতলায় এক ডাক্তারবাবুর চোখে পড়ে সে। তিনি তাঁকে নিজের চেম্বারে ছোটখাটো কাজে লাগান। খাওয়া, থাকার একটা নিরাপত্তা আসে ঠিকই, কিন্তু সুখেন যে স্বপ্ন দেখতে শিখে গেছে!

ছবির প্রতি, অভিনয়ের প্রতি অসম্ভব আকর্ষণ। সিনেমা হলে গিয়ে বারবার ছবি দেখা, অভিনয়ের অনুশীলন। এরপর স্টুডিওর গেটে গেটে ঘোরা শুরু। বারবার ফিরে আসতে হচ্ছে, কারণ ‘চেনা মুখ’ নয় তো!

একদিন এক গেটে দারোয়ানের সঙ্গে তুমুল তর্কে জড়িয়ে পড়ে সে। ঠিক সেই সময় হাজির হন বিখ্যাত শব্দযন্ত্রী জে. ডি. ইরানি। সাহস, জেদ আর চোখের মায়ায় তিনি মুগ্ধ। নিজে হাতে স্টুডিওতে ঢুকতে দেন, আর বলেন—“দেখাও, তুমি কী পারো!” আর ছোট্ট সুখেন যা অভিনয় করে দেখায়, তাতে সবাই মুগ্ধ।

এর কিছুদিন পরেই জীবনের মোড় ঘুরে যায়। বিখ্যাত পরিচালক দেবনারায়ণ গুপ্ত তাঁকে প্রথম সুযোগ দেন ‘দাসীপুত্র’ (১৯৪৯) ছবিতে। তখন বয়স মাত্র ১১! সেখান থেকেই শুরু ‘মাস্টার সুখেন’-এর যাত্রা। সেই একই বছর প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘কুয়াশা’ ছবিতেও শিশু নায়কের চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে।

আর তারপর? আর পেছনে তাকাতে হয়নি। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে আড়াইশোরও বেশি বাংলা ছবিতে অভিনয় করেছেন—নায়ক, খলনায়ক, চরিত্রাভিনেতা—সবই। শুধু অভিনয় নয়, পরিচালনা, কাহিনি লেখা, চিত্রনাট্য রচনাতেও সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন। পঞ্চাশের বেশি ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন, এমনকী নিজেই পরিচালনা করেছেন একাধিক সফল ছবি।

সত্তরের দশকে যখন বাংলা সিনেমা ‘পারিবারিক মেলোড্রামা’র দিকে এগোচ্ছে, তখন তিনি হয়ে উঠেছেন সাফল্যের মুখ। ‘পান্না হীরে চুনী’, ‘সোনা বৌদি’, ‘সিংহ দুয়ার’, ‘জীবন মরণ’, ‘প্রতিশোধ’, ‘স্বর্ণমহল’—এই সব ছবিতে তাঁর অসাধারণ অভিনয় তাঁকে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার শিখরে।

তবে সুখেন দাস শুধু পর্দার মানুষ ছিলেন না—তিনি ছিলেন হৃদয়ের মানুষও। নিজের অতীতের কষ্ট ভোলেননি কখনও। শ্যুটিং ইউনিটে কার কী খাওয়া হল, কে খেতে পেল না—সেই খোঁজ রাখতেন নিজে। নিজে খেতেন সবার শেষে। এই মানবিকতা, এই ভালোবাসাই তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল।

আটের দশকে উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর যখন বাংলা সিনেমা অনিশ্চয়তায় টালমাটাল, তখন তিনিই ছিলেন অন্যতম ভরসার নাম। অঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলা সিনেমার ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। অনেক সমালোচনার মুখেও বাণিজ্যিক ধারার ছবি করেছেন, কারণ তিনি জানতেন, এতে অনেক মানুষের রোজগার জড়িয়ে। কিন্তু, রুচির প্রশ্নে কখনও আপোস করেননি।

সুখেন দাস শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটা সময়ের প্রতিনিধি। একজন অনাথ শিশু কীভাবে নিজের সাহস, নিষ্ঠা আর পরিশ্রমে একদিন আলোয় ভরিয়ে দিতে পারে নিজের জীবন—সেই গল্পই তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন।

আজ তাঁর জন্মদিনে মনে পড়ে যায়—সুখেন দাস মানেই একটা জীবনকথা, চোখ ভেজানো একটা আলোর নাম।