টেলিভিশন বা সিনেমার পর্দায় তাঁকে দেখলেই একটাই শব্দ মাথায় ভেসে উঠত – “দজ্জাল শাশুড়ি”! তাঁর তীক্ষ্ণ চোখ, খোঁচা মারা কথা, আর তীব্র এক্সপ্রেশন – গীতা দে মানেই দর্শকদের মনে এক কুচুটে, নেতিবাচক চরিত্র। কিন্তু পর্দার এই পরিচয়ের পিছনে লুকিয়ে ছিল একেবারেই অন্য একজন গীতা – এক অসাধারণ মানবিক, মমতাময়ী এবং সাহসিনী নারী।
টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায় তাঁকে সবাই ডাকত “গীতা মা” বলে। শুনলে অবাক হবেন, মাত্র ৬ বছর বয়সে গীতা অভিনয়ে পা রেখেছিলেন। ১৯৩৭ সালে ‘আহুতি’ নামের একটা ছবিতে প্রথম সুযোগ পান। এরপর ‘দম্পতি’, ‘নন্দিতা’-র মতো ছবিতে ছোট্ট গীতা নজর কাড়েন সবার। ছোট থেকেই গান আর অভিনয়ের প্রতি ছিল ভীষণ টান। আর সেই আগ্রহ দেখে তাঁর বাবা নিজেই গায়িকার কাছে তালিমের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
তবে গীতার জীবনের আসল লড়াই শুরু হয় বিয়ের পর। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয় কলকাতার তালতলার ব্যবসায়ী অসীমকুমার দের সঙ্গে। শুরুতে সব ঠিকঠাক চললেও, হঠাৎ করেই সব উল্টে যায়। গীতার মা মারা যাওয়ার পর ছোট ভাইবোনদের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি। কিন্তু তাঁর স্বামী সেটা মেনে নিতে পারেননি। শুরু হয় অশান্তি, আর শেষমেশ গীতাকে একা ফেলে রেখে চলে যান তিনি।
এক সময় ভাইবোন আর সন্তানদের নিয়ে রীতিমতো পথে বসেছিলেন গীতা। তখন আবার অভিনয়ই হয়ে উঠল তাঁর বাঁচার পথ। শিশির কুমার ভাদুড়ীর ছাত্র হয়ে থিয়েটারে ফিরলেন গীতা, শুরু করলেন নতুন করে জীবন। এরপর সিনেমায় ফের ডাক আসে – ‘শিল্পী’, ‘লালু ভুলু’, ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘বিয়ের খাতা’ – একের পর এক ছবিতে তাঁর দাপুটে অভিনয় মন কাড়ে দর্শকের।
তাঁর প্রতিভা নজরে পড়ে কিংবদন্তি ঋত্বিক ঘটকের। ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’–তে তাঁর অনবদ্য অভিনয় আজও স্মরণীয়। এমনকি সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গেও কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর।
কিন্তু আপনি জানেন কি, এত বড় প্রতিভা হয়েও অনেক পরিচালক-প্রযোজক তাঁকে প্রাপ্য পারিশ্রমিক দিতেন না? এমনকি ঋতুপর্ণ ঘোষের মতো একজন পরিচালকও তাঁর সঙ্গে এমনটাই করেছিলেন! গীতা দে–র মতো একজন অভিনেত্রীকে কাজ করিয়ে টাকা না দেওয়া, ভাবলেই খারাপ লাগে।
আর সবচেয়ে কষ্টের কথা? জীবনের শেষ সময়ে এই মানুষটাই থেকেছেন একা, নিঃস্ব। যিনি সারা জীবন সবার পাশে থেকেছেন, সেই মানুষটার পাশেই শেষ বয়সে কেউ ছিল না। অভাব-অনটন আর একাকীত্ব নিয়ে কেটেছে তাঁর শেষ দিনগুলো।
আরও পড়ুনঃ “বয়স বাড়ছে, মেয়েও দূরে…”, স্ত্রীকে পাশে রেখেই দিন কাটাচ্ছেন চিরঞ্জিত, আজ একটু একা একা লাগে! স্ত্রীকে নিয়ে কিভাবে দিন কাটাচ্ছেন টলি সুপারস্টার চিরঞ্জিত চক্রবর্তী
পর্দায় কুচুটে শাশুড়ি হলেও, বাস্তবে ছিলেন একদম উল্টো – ভালোবাসায় ভরা এক মানবিক নারী। গীতা দে–র জীবন আসলে এক অপূর্ব অধ্যায়, যেখানে লড়াই আছে, সাফল্য আছে, আবার চরম অবহেলাও আছে। তাঁর জীবনের কাহিনী যেন চোখে জল এনে দেয় – একটা মানুষ কতটা সহ্য করতে পারে, সেটা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন গীতা দে।





