সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও হয়েছিলেন ‘ব্ল্যাকলিস্টেড’! একদিকে সত্যজিৎ, অন্যদিকে মহানায়ক! দুই মহীরুহের লড়াইয়ে টালমাটাল হয়েছিল বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি!

বাংলা চলচ্চিত্রের (Tollywood) স্বর্ণযুগের ইতিহাস মানেই শুধু কালজয়ী সব সৃষ্টি নয়, তার আড়ালে লুকিয়ে আছে নানা নাটকীয় মোড় এবং পেশাদারী সংঘাত। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে কিংবদন্তি অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় সেই সময়ের এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কথা স্মরণ করেছেন। তাঁর বর্ণনায় উঠে এসেছে বিশ্ববরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায় এবং মহানায়ক উত্তম কুমারের মধ্যকার এক অভূতপূর্ব দ্বন্দ্বের চিত্র। চলচ্চিত্র শিল্পের স্বার্থ ও নিয়মনীতির প্রশ্নে দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন তৎকালীন টলিউডের এই দুই মহীরুহ, যা শেষ পর্যন্ত ইন্ডাস্ট্রির বেশ কিছু প্রভাবশালী অভিনেতার ক্যারিয়ারে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছিল।

এই সংঘাতের মূলে ছিল ছবি মুক্তির তারিখ এবং ‘শিল্পী সংসদ’-এর কঠোর নিয়মনীতি। জানা যায়, তৎকালীন সময়ে সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী সৃষ্টি ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ এবং অন্য একটি চলচ্চিত্র ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর মুক্তি নিয়ে বিবাদ শুরু হয়। শিল্পী সংসদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, আগে নির্দিষ্ট তালিকার ছবি মুক্তি পাবে এবং তার পরেই অন্য ছবি আসবে। কিন্তু নিজের ছবির প্রযোজকের আর্থিক ক্ষতির কথা চিন্তা করে সত্যজিৎ রায় তাঁর ছবিটি দ্রুত মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। এই নিয়মের সংঘাত থেকেই শুরু হয় সেই ঐতিহাসিক ‘সত্যজিৎ রায় বনাম উত্তম কুমার’ অধ্যায়, যেখানে শিল্পের স্বাধীনতার সাথে লড়াইতে নামে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা।

বিবাদটি কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা রাজপথে এবং সিনেমা হলের দরজায় পৌঁছে গিয়েছিল। গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে প্রেক্ষাগৃহের সামনে ব্যাপক পিকেটিং শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা দর্শকদের অনুরোধ করতে থাকেন যাতে তারা টিকিট না কাটেন। উত্তেজনার পারদ চড়তে চড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে দু’পক্ষের মধ্যে রীতিমতো মারামারির উপক্রম হয়েছিল। একদিকে ছিল সত্যজিৎ রায়ের নিজের সৃষ্টির প্রতি দায়বদ্ধতা, আর অন্যদিকে ছিল উত্তম কুমারের নেতৃত্বে শিল্পী সংসদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ।

এই ঐতিহাসিক লড়াইয়ের পরিনতি ছিল বেশ সুদূরপ্রসারী এবং বেদনাদায়ক। এই আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার কারণে সেই সময়ের বেশ কিছু অগ্রণী অভিনেতাকে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, অনুপ কুমার এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো শ্রদ্ধেয় অভিনেতাদের সেই সময় ‘ব্ল্যাকলিস্টেড’ বা কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। ক্ষুব্ধ প্রযোজকরা ঘোষণা করেছিলেন যে, এই অভিনেতারা যেসব ছবিতে অভিনয় করবেন, সেই সব ছবি তারা কিনবেন না বা কাজ করবেন না। এটি ছিল বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক অন্ধকারময় সময় যখন মেধাবী শিল্পীদের পেশাদারী জীবন সংকটের মুখে পড়েছিল।

পরিশেষে বলা যায়, সত্যজিৎ রায় এবং উত্তম কুমারের এই দ্বন্দ্ব কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না, বরং তা ছিল দুটি ভিন্ন আদর্শের সংঘাত। একদিকে ছিল প্রযোজকের স্বার্থ রক্ষা ও কাজের মুক্তি, অন্যদিকে ছিল চলচ্চিত্র শিল্পের সামগ্রিক নিয়মনীতি ও সংহতি। গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই নতুন তথ্যগুলি বর্তমান প্রজন্মের কাছে সে আমলের টলিউডের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ এবং শিল্পীদের সংগ্রামের এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে। ইতিহাসের এই পাতাগুলি প্রমাণ করে যে, বাংলা চলচ্চিত্রের পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না, বরং অনেক চড়াই-উতরাই পার করেই আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছে।