আবীর চট্টোপাধ্যায়কে সাধারণত শান্ত, ভদ্র, সংযত মানুষ হিসেবেই চেনে দর্শক। তবে সামনাসামনি কথোপকথনে এই ভদ্রতার আড়াল ফাঁক করলেই একেবারে অন্য আবীরকে দেখা যায়। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি একের পর এক এমন মন্তব্য করেছেন, যা অনেকের চোখ কপালে তুলতে বাধ্য। কখনও সহ-অভিনেত্রী মিমিকে নিয়ে, কখনও সমসাময়িক নায়ক দেবকে নিয়ে, আবার কখনও নিজের ব্যক্তিগত বিশ্বাস নিয়ে তিনি অকপটে যা বলেছেন, তা নিঃসন্দেহে বিতর্কের খোরাক।
প্রথমেই আসে মিমি চক্রবর্তী প্রসঙ্গ। নতুন ছবির একটি গানে মিমিকে নীল বিকিনিতে দেখে সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড় হলেও আবীরের প্রতিক্রিয়া যেন একেবারেই ঠান্ডা। বরং তিনি সোজাসুজি বলেছেন, “মিমিকে এত ছোট থেকে দেখছি যে আলাদা করে নায়িকা হিসেবে ভাবতেই পারি না।” এখানেই থেমে থাকেননি, তিনি আরও যোগ করেন, ফুকেটের সৈকতে মিমিকে বিকিনিতে দেখে কোনও রোমাঞ্চ হয়নি। একদিকে ভক্তরা যেখানে মিমির নতুন অবতারে চোখ ফেরাতে পারছেন না, সেখানে নায়ক এত নির্লিপ্ত কেন? অনেকের কাছেই এই মন্তব্য মিমির প্রতি ‘ডিসক্রেডিট’ বলে মনে হতে পারে।
তবে আবীর নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন—সহঅভিনেত্রী হিসেবে মিমির কঠোর পরিশ্রম, ডায়েট মেনে চলা, শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন—এসবের জন্যই তিনি গর্বিত। কিন্তু নায়িকার মোহে মজেছেন কি না, সে প্রশ্নে তিনি নির্দ্বিধায় “না” বলে দিয়েছেন। এই অকপটতাই একদিকে প্রশংসনীয়, আবার অন্যদিকে কিছুটা ঠাণ্ডা-গরম প্রতিক্রিয়াও তৈরি করেছে।
এরপর আসে প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গ। পুজোয় দেবের ছবি বনাম আবীরের ছবি—কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে—এই চর্চা তো চলবেই। কিন্তু আবীর যেন একেবারেই অন্য সুরে গান ধরলেন। “আমি স্কোরবোর্ডে বিশ্বাসী নই। অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামব না।” সাধারণত নায়করা প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বীকার করলেও নিজের সেরাটা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু আবীর সরাসরি প্রতিযোগিতার ধারণাটাকেই অস্বীকার করলেন। প্রশ্ন উঠছে—এ কি আত্মবিশ্বাস, নাকি দায়িত্ব এড়ানো? বিশেষ করে দেব যখন টানা হিট দিচ্ছেন, তখন আবীরের এই নির্লিপ্তি কি নিরাপদ আশ্রয় নয়?
তবে একইসঙ্গে তিনি দেবকে কৃতিত্ব দিতে কুণ্ঠা বোধ করেননি। বলেছেন, দেব বাংলা সিনেমার ইতিহাস নতুন করে লিখছেন, প্রচারে মাঠেঘাটে পৌঁছে যাচ্ছেন, যা একেবারেই প্রশংসার দাবি রাখে। প্রতিযোগিতা মানতে চান না, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বীর কৃতিত্ব খোলাখুলি স্বীকার—এটাও একপ্রকার সাহসী অবস্থান।
সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্য অবশ্য এসেছিল ব্যক্তিগত বিশ্বাস নিয়ে। আজকাল বহু তারকাই আধ্যাত্মিক গুরুর শরণাপন্ন হন, প্রকাশ্যে ধর্মীয় আচার পালন করেন। কিন্তু আবীর নির্দ্বিধায় বলেছেন, “আমি নাস্তিক। আধ্যাত্মিক গুরুতে আমার কোনও বিশ্বাস নেই। আমার স্থিরতা আসে পরিবার থেকে।” এই সরাসরি ঘোষণা অনেকেরই চক্ষু চড়কগাছ করে দিতে পারে। এমন স্পষ্ট স্বীকারোক্তি বাঙালি তারকাদের মুখে সচরাচর শোনা যায় না।
অভিনয়ের টেকনিক্যাল দিকেও তিনি যথেষ্ট খোলামেলা। নিজের প্রথমদিকের ডাবিং ভয়, খামতি সব স্বীকার করে নিয়েছেন। জানিয়েছেন, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত আর রাজ চক্রবর্তী তাঁকে ডাবিংয়ে হাতেকলমে সাহায্য করেছেন। আজ তিনি জানেন, ক্যামেরার সামনে কমতি থাকলেও ডাবিংয়ে তা সামলে নিতে পারবেন। এমন স্পষ্টবাদিতা অনেক অভিনেতা এড়িয়ে যান।
সব মিলিয়ে আবীরের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার যেন ভদ্র অথচ বিস্ফোরক। একদিকে সহ-অভিনেত্রী মিমিকে ঘিরে আলোড়নকে পাত্তা না দেওয়া, অন্যদিকে প্রতিযোগিতাকে ‘অসুস্থ’ বলে নাকচ করা, আবার শেষমেশ নিজের নাস্তিক পরিচয় প্রকাশ করা—সবটাই মিলে বেশ কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। দর্শক এখন ভাবছেন, এই অকপট আবীর কি সত্যিই নির্লিপ্ত? নাকি এটাই তাঁর আসল অস্ত্র, যা দিয়ে তিনি ভিড়ের মধ্যে থেকেও আলাদা হয়ে থাকেন?
আরও পড়ুনঃ স্বামীকে নিয়ে কটাক্ষ! ক্ষেপে উঠলেন শ্রীময়ী! সোজা থানায় যাওয়ার হুমকি দিলেন তিনি!
শান্ত অথচ বিতর্কিত এই বক্তব্যগুলো প্রমাণ করে, আবীর চট্টোপাধ্যায় শুধু চরিত্রে নয়, বাস্তব জীবনেও নিজের মতো করেই খেলতে ভালোবাসেন। কারও খুশি করার জন্য মুখোশ পরে চলেন না, আর এই স্পষ্টভাষী সত্তাই তাঁকে একইসঙ্গে প্রশংসিত ও সমালোচিত করছে।





