ভারতের সংগীতজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এআর রহমান। সুরের জাদুতে তিনি জয় করেছেন দেশ-বিদেশের কোটি মানুষের মন। কিন্তু এই বিশ্বখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীর জীবনের এক অধ্যায় খুব কম মানুষই জানেন—এক সময় তাঁর নাম ছিল দিলীপ কুমার। জন্মসূত্রে তিনি ছিলেন এক হিন্দু পরিবারে। কিন্তু খুব অল্প বয়স থেকেই সেই নামটি তাঁর কাছে অচেনা, বেমানান মনে হত। বহু বছর পরে, এক হিন্দু জ্যোতিষীর পরামর্শেই তিনি ‘রহমান’ নামটি বেছে নেন—যা আজ সারা বিশ্বে এক কিংবদন্তির পরিচয় বহন করছে।
এআর রহমানের জীবনে বড় মোড় আসে বাবার মৃত্যুর পর। ছোটবেলায় বাবার অনুপস্থিতি তাঁর জীবনকে এক গভীর শূন্যতায় ফেলে দিয়েছিল। সেই সময় থেকেই তিনি আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি নিজের ভেতরে এক ধরনের টান অনুভব করেন—যে টান তাঁকে নিয়ে যায় ধর্ম ও আত্মচেতনার নতুন পথে। এক সাক্ষাৎকারে রহমান নিজেই স্বীকার করেছেন, জন্মসূত্রে পাওয়া ‘দিলীপ কুমার’ নামটির সঙ্গে তিনি কখনও সংযোগ অনুভব করতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, “সত্যিটা হল, আমি জীবনে আমার নামটা পছন্দ করিনি। ‘দিলীপ কুমার’ নামের প্রতি কোনও অশ্রদ্ধা নেই, কিন্তু আমার ভাবমূর্তির সঙ্গে সেটা যায় না।”
রহমানের জীবনের মোড় ঘোরানো ঘটনাটি ঘটে একদিন তাঁর মা-র সঙ্গে। বোনের বিয়ের আলোচনা নিয়ে তাঁরা এক হিন্দু জ্যোতিষীর কাছে গিয়েছিলেন। তখনও তাঁরা ধর্ম পরিবর্তন করেননি। কথাবার্তার ফাঁকে রহমান নিজের নাম বদলানোর ইচ্ছার কথা জানান। জ্যোতিষী তাঁকে দুটি নাম প্রস্তাব করেন—‘আবদুল রহমান’ ও ‘আবদুল রহিম’। রহমান বলেছিলেন, “আমার ‘রহমান’ নামটা পছন্দ হয়। ওটাই বেছে নিই। মজার ব্যাপার হল, একজন হিন্দু জ্যোতিষীই আমাকে এই মুসলিম নাম দিয়েছিলেন।”
এই ঘটনার পর থেকেই তাঁর জীবনে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। ধর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত শুধু তাঁর একার ছিল না, বাবার মৃত্যুর পরে গোটা পরিবারই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। রহমানের মা বলেছিলেন, তাঁর নাম হওয়া উচিত ‘আল্লারাখা’। পরে তিনিই সেই নামের সঙ্গে ‘আবদুল রহমান’ যুক্ত করে ছেলের নতুন পরিচয় তৈরি করেন—‘এআর রহমান’। ধীরে ধীরে এই নামই হয়ে ওঠে তাঁর আত্মপরিচয়ের প্রতীক, তাঁর বিশ্বাসের প্রতিফলন।
আরও পড়ুনঃ কাঞ্চনের অভিমানে বন্ধ হয়েছিল পুজো! সেই অভিমানের অন্ধকারে আলো জ্বালালেন কাঞ্চন পত্নী শ্রীময়ী!
আজ এআর রহমান শুধু এক জন সঙ্গীতকার নন, তিনি এক প্রেরণা। তাঁর জীবনের গল্প শেখায়, আত্ম-অনুসন্ধানের পথ অনেক সময় সামাজিক নিয়মের বাইরে গিয়েও শুরু হয়। জন্মসূত্রে পাওয়া নাম বা ধর্ম নয়, মানুষ হয়ে ওঠে নিজের অন্তরের বিশ্বাস ও সত্তা থেকে। রহমানের মতো শিল্পীর কাছে সেই যাত্রাই ছিল আত্ম-চেতনার এক সুরেলা রূপান্তর—যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছুঁয়ে যায় কোটি মানুষের হৃদয়।





