এবার শোনো এক বিস্ফোরক কাহিনি, যা হয়তো অনেকেই জানেন না। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর মতো কালজয়ী ছবিকে নিয়ে একসময় সরাসরি হাত বাড়িয়েছিলেন বলিউডের শো-ম্যান রাজ কাপুর। আর সেই প্রস্তাব এতটাই চমকে দেওয়ার মতো ছিল যে, সত্যজিৎ রায় নিজেও প্রথমে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কল্পনা করো, যদি সত্যজিৎ রাজ কাপুরের কথায় রাজি হতেন, তাহলে আজ হয়তো আমরা যে ছবিকে বাংলার রূপকথার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করি, তা হিন্দিতেই তৈরি হত। গুপীর জায়গায় থাকতেন রাজ কাপুরের ছেলে রণধীর কাপুর। আর বাঘার ভূমিকায়? রাজ কাপুর চেয়েছিলেন বাংলার একজন অভিনেতা থাকুক, কিন্তু কে হবেন, তা তখনও স্থির হয়নি।
ঘটনাটা ঘটেছিল ষাটের দশকে। সেসময় থেকেই সত্যজিতের ভক্ত ছিলেন রাজ কাপুর। তাই খবর পাওয়া মাত্রই সত্যজিৎকে সরাসরি মুম্বই ডেকে পাঠান তিনি। উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার—‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’কে বলিউডি প্রেক্ষাপটে দাঁড় করানো। ভাবা যায়? যে গল্পটা নিখাদ বাংলার লোককথা, সেটাকে তখনকার সবচেয়ে বড় প্রযোজক-অভিনেতা চেয়েছিলেন হিন্দি বাজারের জন্য তুলে ধরতে। প্রযোজক হওয়ার প্রস্তাব দিয়ে রাজ কাপুর সোজাসাপ্টা বলে দেন, ‘‘আপনি বাংলায় নয়, হিন্দিতে ছবি করুন। বাকিটা আমি সামলে নেব।’’
কিন্তু এখানেই শুরু হয় বিতর্ক। সত্যজিৎ রাজ কাপুরের অফার শুনে সম্মান জানালেও, সময় নষ্ট না করে সরাসরি না বলে দেন। তাঁর যুক্তি ছিল সহজ—এই গল্প বাংলার, এই চরিত্রগুলো বাংলার, তাই বাংলাতেই জন্ম নেবে এদের। রণধীর কাপুর হয়তো তখনও হিরো হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন, কিন্তু সত্যজিৎ জানতেন, গুপী-বাঘার মতো অদ্ভুতুড়ে চরিত্রের প্রাণ বেরিয়ে যাবে যদি সেটাকে জোর করে হিন্দির চকচকে ফ্রেমে ফেলা হয়। তাই তিনি রাজের হাত ধরে বলিউডি পথে হাঁটলেন না।
সত্যজিতের এই সিদ্ধান্তে অনেকেই তখন অবাক হয়েছিলেন। বলিউডের মতো এক মহারথীর প্রযোজনা ফিরিয়ে দেওয়ার সাহস ক’জনের থাকে? বিশেষত, যখন সেই প্রস্তাব আসছে সরাসরি রাজ কাপুরের কাছ থেকে! তবে এখানেই বোঝা যায় সত্যজিতের দূরদর্শিতা। তিনি জানতেন, নিজের শিকড়ে দাঁড়িয়ে থাকলেই শিল্প বাঁচবে। তাই কলকাতার অসীম দত্ত ও নেপাল দত্ত নামের দুই প্রযোজকের হাত ধরে তৈরি হল ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’। ১৯৬৯ সালে মুক্তি পেয়ে ছবিটি ইতিহাস তৈরি করে।
আরও পড়ুনঃপুরুষ ছাড়াই নারীরা অন্তঃসত্ত্বা! উত্তর খুঁজতে জেলে হাজির শুভশ্রী! প্রশ্ন তুলতেই মারধর!
তবে এই প্রত্যাখ্যানেও দুই মহারথীর সম্পর্ক নষ্ট হয়নি। বরং রাজ কাপুর ছবিটি দেখে সত্যজিতকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। কিন্তু আজও প্রশ্ন থেকে যায়—যদি সত্যজিৎ সেই দিন রাজ কাপুরের প্রস্তাবে সায় দিতেন, তাহলে কি ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ এতটাই কালজয়ী হতে পারত? নাকি সেটি হারিয়ে যেত হিন্দি ফ্যান্টাসি সিনেমার ভিড়ে? উত্তর মেলে না, কিন্তু বিতর্কটা থেকে যায় চিরকাল।





