সমাজে শ্যামবর্ণা মানুষদের নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, কটাক্ষ আর অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য যেন বহুদিনের চর্চা। মানুষ যত শিক্ষিত হচ্ছে বলে মনে হয়, ততই হয়তো ভদ্রতার মোড়কে আঘাত করার কৌশল নিখুঁত করে ফেলছে। তবে ভাল লাগার কথা একটাই—এই সমাজে পরিবর্তন এসেছে। ধীর গতি হলেও এসেছে। আমি নিজেই তার সাক্ষী। আমার গায়ের রং নিয়ে একসময় যারা নাক সিঁটকাত, তারাই আজ স্বীকার করেন, ত্বকের রঙ নয়, সাফল্য আর ব্যক্তিত্বই একজন মানুষকে সুন্দর করে।
ছোটবেলায় মা-বাবা কখনও আমার গায়ের রঙ নিয়ে হীনমন্যতা তৈরি করেননি। তাঁরা শিক্ষা দিয়েছেন আত্মবিশ্বাসী হতে, নিজের মতো করে বাঁচতে। কিন্তু সমাজ কি কাউকে এত সহজে ছাড়ে? যৌথ পরিবারে বড় হয়েছি, ফলে আত্মীয়স্বজনের মন্তব্য শুনতে হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এক পিসিমা নিত্য বলে যেতেন—“এই গায়ের রঙ নিয়ে কবে বিয়ে হবে?” বিদ্রুপ লুকোনো থাকত সৌজন্যের কথার আড়ালে। অথচ সেই পিসিমাই ১৯৫০ সালে নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিলেন, আর তাঁর গায়ের রঙ ছিল আমার থেকেও গাঢ়। এই দ্বিচারিতা বুঝতে তখন সময় লেগেছিল, আজ আর লাগে না—এটাই আমাদের সমাজ।
পাড়ায়, স্কুলে, কোচিং সেন্টারে—সব জায়গাতেই শুনেছি “কালো” শব্দটা চাবুকের মতো লাগে। মনে হতো, কালো মানেই কি খারাপ? কালো মানেই কি কুৎসিত? আমার মনের প্রথম আশ্রয় দিয়েছিলেন পরিচালক গৌতম ঘোষ। ‘কালবেলা’ ছবির সেটে দাঁড়িয়ে একদিন বলেছিলেন, “তোর গায়ের রংটা অসাধারণ।” কারও কাছ থেকে প্রথমবার এমন প্রশংসা পেয়েছিলাম। তাই আজও সেই কথা বুকের মধ্যে শক্তি জোগায়। অথচ এই ত্বকই একসময় আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার হয়েছিল। চাপা রঙের কারণে দেবের বোনের চরিত্র করতে হয়েছিল ‘আই লাভ ইউ’ ছবিতে। নায়িকা হতে হলে নাকি ফর্সা হতে হয়—তখন ইন্ডাস্ট্রিতে এমনটাই মান্যতা ছিল।
কিন্তু সময় পাল্টেছে, পাল্টেছি আমিও। ‘সাঁঝবাতি’তে সেই একই নায়কের বিপরীতে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছি। আমি তখনই বলেছিলাম—শ্যামবর্ণা মেয়েদের উন্নতি হয়েছে। তবে শুধু নিজের অভিনয় নয়, প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেয়েছিলাম চরিত্র বাছাইয়ের মধ্যে। এমন চরিত্র করেছি যেখানে গায়ের রং পরিচয়ের অংশ, লড়াইয়ের হাতিয়ার। অভিনয়ের মাধ্যমে বলতে চেয়েছি—চাপা রঙ মানে অবদমিত নয়, শক্তি। ধীরে ধীরে সহকর্মীরাও বুঝেছেন, সৌন্দর্যের আলাদা কোনও রঙ নেই, আত্মবিশ্বাসের থাকে।
আজ আর পূর্বের সেই হাস্যকর মানসিকতা তেমন নেই। ‘ফেয়ারনেস’ ক্রিমের বাজার যেখানে একসময় গরম ছিল, আজ তা লজ্জিত হয়ে অস্তিত্ব বাঁচানোর চেষ্টা করছে। বিজ্ঞাপনেও আর চলে না ত্বকের রঙ নিয়ে বৈষম্য। মানুষ এখন শিখছে—নিজেকে বদলানোর নয়, গ্রহণ করার নামই সৌন্দর্য।
আরও পড়ুনঃ ধনতেরাসে ছোট্ট কৃষভির জন্য সোনার উপহার, ‘লক্ষ্মীমন্ত’ মেয়েকে নিয়ে আবেগী কাঞ্চন–শ্রীময়ী
শেষে একটা কথা বলতে চাই—যাঁরা আমার মতো বা আমার থেকেও শ্যামবর্ণা, তাঁরা মনখারাপ করবেন না। কালোর মধ্যে এক ধরনের গভীর রহস্য আছে, এক অদম্য আকর্ষণ আছে। বলিউডের রেখা কি শুধু সুন্দর? না, তিনি রহস্যময়। তাঁর ব্যক্তিত্বই তাঁকে স্মরণীয় করেছে। তাই কালো হওয়া লজ্জার নয়, গর্বের। কেউ যদি আজও আপনার গায়ের রঙ নিয়ে মন্তব্য করে, জেনে রাখবেন—ওই মানুষটা সমস্যাগ্রস্ত, আপনি নন। নিজের স্বপ্নকে লালন করুন, সুযোগ এলে লড়াই করুন। পরিবর্তন সম্ভব—আমি সেই পরিবর্তনের অংশ হয়েছি, আপনিও পারবেন।





