টলিউড ইন্ডাস্ট্রির (Tollywood) অত্যন্ত পরিচিত এবং গ্ল্যামারাস মুখ নন্দিনী চ্যাটার্জি (Nandini Chatterjee)। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। মূলত ঋজু ব্যক্তিত্ব এবং আভিজাত্যপূর্ণ চরিত্রে তাকে বেশি দেখা গেলেও, বাস্তব জীবনে তিনি একাধারে স্নেহময়ী জননী এবং লড়াকু নারী। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে অভিনয় জগতে পদার্পণ করা এই অভিনেত্রী সম্প্রতি এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তার ব্যক্তিজীবনের এমন কিছু পরত উন্মোচন করেছেন, যা এতদিন পর্দার আড়ালেই ছিল। রূপোলি পর্দার এই জনপ্রিয় অভিনেত্রীর জীবনের কঠিন সংগ্রাম এবং বর্তমানের আধ্যাত্মিক উত্তরণ নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
নন্দিনী চ্যাটার্জির অভিনয় জীবনের শুরুটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। এক অত্যন্ত রক্ষণশীল পরিবারে বড় হওয়া এই অভিনেত্রীর জন্য থিয়েটার বা নাটকের জগৎ ছিল পরিচিত, কিন্তু পেশা হিসেবে অভিনয়কে বেছে নেওয়া ছিল নিষিদ্ধ। তার বাপের বাড়িতে শুধুমাত্র পরিচিত নাট্যকারদের সঙ্গেই কাজ করার অনুমতি ছিল। বিয়ের পর যখন তিনি এক উচ্চবিত্ত পরিবারে প্রবেশ করেন, তখনও পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি। তার শ্বশুরমশাই স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে তিনি চান না বাড়ির বউ অভিনয়কে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিক। তবে জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন সংসারের দায়িত্ব এবং নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই সামনে এসে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত শ্বশুরমশাইয়ের আশীর্বাদ নিয়েই তিনি পুনরায় ক্যামেরার সামনে ফেরেন এবং নিজের যোগ্যতায় ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা করে নেন।
নান্দনিক সৌন্দর্যের অধিকারিণী এই অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত জীবন ছিল ঝোড়ো হাওয়ার মতো। খুব অল্প বয়সে বিয়ে এবং মাতৃত্বের স্বাদ পেলেও দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। সাক্ষাৎকারে তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, তার স্বামী বন্ধু-বান্ধবদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিপথে চালিত হয়েছিলেন এবং দিনের পর দিন বাড়িতে অনুপস্থিত থাকতেন। এমনকি অর্থনৈতিকভাবেও তিনি কোনও সহায়তা পেতেন না। সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নন্দিনীকে ডোর-টু-ডোর অর্থাৎ বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই বিক্রি করার মতো কঠোর পরিশ্রমও করতে হয়েছে। এক হাতে দুই সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করার যে লড়াই তিনি লড়েছেন, তা আজ অনেক নারীর কাছেই অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাইরে থেকে নন্দিনীকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী মনে হলেও তার মনের গভীরে লুকিয়ে ছিল শৈশবের কিছু অমীমাংসিত ক্ষত। তিনি জানান যে ছোটবেলায় তার নিজের পরিবারের নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকেই তাকে গায়ের রং বা দাঁতের গঠন নিয়ে কটু কথা শুনতে হয়েছে। এই ধরণের ক্রমাগত বিদ্রুপ তার মনে এক গভীর হীনম্মন্যতা বা ‘ইনফিয়ারিটি কমপ্লেক্স’ তৈরি করেছিল। সামাজিক অনুষ্ঠানে তিনি হাসতে বা কথা বলতে ভয় পেতেন যাতে কেউ তাকে প্রত্যাখ্যান না করে। বাইরের মানুষ যেটিকে তার ‘অহংকার’ বা ‘গাম্ভীর্য’ বলে মনে করতেন, আসলে সেটি ছিল তার মানসিক ট্রমা লুকানোর একটি সুরক্ষা কবচ বা শিল্ড। এই অভিজ্ঞতাই তাকে শিখিয়েছে যে বাইরের সৌন্দর্যের চেয়ে অভ্যন্তরীণ গুণাবলী অনেক বেশি মূল্যবান।
বর্তমানে নন্দিনী চ্যাটার্জি মুম্বাইয়ের হিন্দি টেলিভিশন ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করছেন। দীর্ঘদিনের টলিউড অভিজ্ঞতার সঙ্গে মুম্বাইয়ের কাজের পরিবেশ তুলনা করতে গিয়ে তিনি বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তার মতে, কলকাতায় এক ধরণের ‘লবি’ কালচার বা গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রবল, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু দলের বাইরে প্রতিভাবান শিল্পীদের কাজ পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে মুম্বাইয়ে প্রফেশনালিজম বা পেশাদারিত্বের গুরুত্ব অনেক বেশি। সেখানে অনুপম খেরের মতো কিংবদন্তি অভিনেতার অফিসে সরাসরি গিয়ে কথা বলা যতটা সহজ, কলকাতায় প্রথম সারির পরিচালকদের কাছে পৌঁছানো তার চেয়েও কঠিন। এই বৈষম্যই তাকে নতুন দিগন্তের সন্ধানে ঘর ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করেছে।
জীবনের সমস্ত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অভিনেত্রী আজ এক শান্ত এবং স্থির উপলব্ধিতে পৌঁছেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে সময়ের আগে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঈশ্বর কাউকে কিছু দেন না। অন্যের অর্জনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করাই হলো দুঃখের মূল কারণ। যেদিন মানুষ এই তুলনা করা বন্ধ করে পরিস্থিতিকে মেনে নিতে শেখে, সেদিন থেকেই তার মানসিক প্রশান্তি শুরু হয়। বর্তমানে তিনি আধ্যাত্মিকতার মধ্যে নিজের আশ্রয় খুঁজে পেয়েছেন এবং কোনো নির্দিষ্ট মানুষের ওপর নির্ভর না করে ‘উপরওয়ালার’ ওপর সম্পূর্ণ সমর্পণ করেছেন। এই ইতিবাচক জীবনদর্শনই আজ তাকে নতুন করে বাঁচতে এবং কাজ করতে শক্তি জোগাচ্ছে।





